নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুর, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা জোরদার করছে বিএনপি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দলীয় পদ বা প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে বহিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখল, হামলা-ভাঙচুরসহ নানা অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে আলোচনা জোরালো হয়েছে। এসব অভিযোগের তথ্য তৃণমূল থেকে সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, যথাযথ তদন্তের পর কোনো নেতাকর্মীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে কেউ দলের নাম ব্যবহার করতে পারবেন না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও দলের পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক, বেআইনি, সহিংস বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠলেই শাস্তি নয়
তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হলে তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার কথাও বলা হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুর এবং ইসিবি এলাকায় কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনের নাম আলোচনায় আসে। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। তবে বিএনপির সাম্প্রতিক সাংগঠনিক বিজ্ঞপ্তিগুলোতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনাকে সরাসরি বহিষ্কারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
ঢাকা উত্তরে একসঙ্গে একাধিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা
এই অবস্থানের মধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই দিনে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে। যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্তির কারণ হিসেবে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ১৪ নেতাকর্মীকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী, অনৈতিক বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর মধ্যে বিএনপির তিন নেতাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ছাত্রদলের পাঁচজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুজন এবং শ্রমিক দলের চারজনের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর আগের দিন পল্লবী থানার ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতিকেও একই ধরনের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে নজরদারি
বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, দলের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের সুযোগ বন্ধ করতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি, জমি দখল, সহিংসতা, ভাঙচুর এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ বারবার উঠছে—এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই শেষে প্রয়োজন অনুযায়ী বহিষ্কার, দায়িত্ব প্রত্যাহার বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না; প্রয়োজনে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
দলীয় নেতৃত্বের এই অবস্থানের ফলে বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড এবং দলের পরিচয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে আগামী দিনে আরও কিছু পদক্ষেপ আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
✍️ মন্তব্য লিখুন