০১ মার্চ ২০২৬, ১০:২৫ AM
দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে তা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে গণসাক্ষরতা অভিযান। একই সঙ্গে প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এবং এ স্তরে অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাব-এ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর এই মোর্চা। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষিত শিক্ষা–সংক্রান্ত ১২ দফা প্রতিশ্রুতির বিষয়ে পরামর্শ জানাতেই এ আয়োজন করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী জানান, তাদের প্রস্তাব ও সুপারিশ ইতোমধ্যে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি শক্ত ভিত্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”
বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে আপত্তি
বৃত্তি পরীক্ষার বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রাথমিক-মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান মনজুর আহমদ বলেন, অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য নিম্ন শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা উপযোগী নয়; বরং বিদ্যালয়ভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে।
তিনি বলেন, “পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা একসময় বাদ দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার তা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষাও হয়েছে, আবারও হবে—এভাবে আসলে পাবলিক পরীক্ষার সংস্কৃতি ফিরে আসছে।”
অধ্যাপক মনজুর আহমদের মতে, বৃত্তি পরীক্ষায় শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়ন হয় না। এতে মূলত ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভালো শিক্ষার্থী কিছু প্রণোদনা পায়। কিন্তু যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পিছিয়ে আছে, তাদের উন্নয়নের দিকে বেশি নজর দেওয়া জরুরি। তিনি বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্তকে “সুবিবেচনাপ্রসূত নয়” বলে মন্তব্য করেন।
‘ব্রিজ কোর্স’ ও শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষিত ‘ব্রিজ কোর্স’ উদ্যোগকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে গণসাক্ষরতা অভিযান বলেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পর যোগ্যতা অনুযায়ী পেশাগত বা বৃত্তিমূলক ধারায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। তাদের মতে, এটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন সম্ভব।
সংগঠনটি জানায়, শিক্ষাক্রম ও পরীক্ষা পদ্ধতি ‘রিভিউ’ করার সময় শ্রেণিভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত প্রণোদনা বা ভাতার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
কোচিং-নির্ভরতা কমানোর আহ্বান
রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপে ধারাবাহিক মূল্যায়নের গুরুত্ব কমে গেছে। বৃত্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কোচিং ও গাইড বই-নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “শিক্ষার্থীরা যদি শুধু গাইড বই পড়ে ও কোচিং সেন্টারে যায়, তাহলে স্কুলের প্রয়োজন কী?”
সংগঠনটি মনে করে, শিক্ষার্থীরা যেন ‘শুধু পরীক্ষার্থী’ হয়ে না ওঠে—এ বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত।
অন্যান্য সুপারিশ
লিখিত বক্তব্যে আরও যেসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—অষ্টম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা শুরু, বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সব শিশুর জন্য মিড ডে মিল চালু, সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়ন এবং পরামর্শক কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ বিবেচনা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন এডুকেশন ওয়াচের আহ্বায়ক আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ, ক্যাথলিক এডুকেশন বোর্ডের সাধারণ সম্পাদক জ্যোতি এফ গমেজ প্রমুখ।
বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেলেও বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় বিষয়। তিনি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা পরিকল্পনার জন্য বিশেষজ্ঞ বা টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন।
তার মতে, শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। পাশাপাশি রাজনৈতিক অপপ্রভাব বন্ধ করে টেকসই ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
✍️ মন্তব্য লিখুন