নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় নারকেলের ছোবড়া ছিল ফেলনা। কেউ ফেলে দিতেন, কেউ ব্যবহার করতেন রান্নার জ্বালানি হিসেবে। সেই ছোবড়াই এখন লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নারকেলের ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করে আঁশ ও গুঁড়া তৈরি করছেন উদ্যোক্তারা। এসব কাঁচামাল থেকে তৈরি হচ্ছে গদি, জাজিম, দড়ি, পাপোশসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য। পাশাপাশি কৃষিকাজেও ব্যবহার হচ্ছে ছোবড়ার গুঁড়া।
প্রথম আলো ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে নারকেলের ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রায় ৩০টি ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। এসব কারখানাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্রশিল্প, তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ।
ছোবড়া থেকে তৈরি হচ্ছে নানা পণ্য
নারকেলের ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করে মূলত দুটি উপকরণ পাওয়া যায়—আঁশ ও গুঁড়া। ছোবড়ার আঁশকে কোকো ফাইবার বলা হয়। এই আঁশ দিয়ে গদি, জাজিম, সোফা ও চেয়ারের কুশন, দড়ি, স্লিপার, খেলনা এবং বিভিন্ন শৌখিন সামগ্রী তৈরি করা হয়।
অন্যদিকে, আঁশ আলাদা করার সময় যে গুঁড়া পাওয়া যায়, তা কোকোডাস্ট নামে পরিচিত। ছাদবাগান, নার্সারি ও অন্যান্য কৃষিকাজে মাটির বিকল্প বা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে এই উপকরণ ব্যবহার করা হয়। পানি ধরে রাখার সক্ষমতার কারণে কৃষিকাজে কোকোডাস্টের ব্যবহার বাড়ছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজারসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব কারখানা গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া রায়পুরের হায়দরগঞ্জ, মান্দারী, চন্দ্রগঞ্জ, রামগঞ্জের কয়েকটি এলাকা, কমলনগরের হাজিরহাট এবং রামগতির আলেকজান্ডার ও জমিদারহাটেও ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান
কারখানাগুলোতে ছোবড়া সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, আঁশ পৃথক করা, শুকানো ও বাজারজাত করার কাজে শ্রমিকেরা যুক্ত রয়েছেন। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারখানাপ্রতি সাধারণত ৮ থেকে ১২ জন শ্রমিক কাজ করেন। ফলে এই শিল্প স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজারের একটি কারখানার মালিকের বরাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি নারকেলের ছোবড়া ২ থেকে ৩ টাকায় কেনা হয়। একটি কারখানা থেকে মাসে কয়েক ট্রাক আঁশ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। প্রতি ট্রাক আঁশের দাম ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ছোবড়ার গুঁড়াও বিক্রি হয় আলাদাভাবে।
নারকেল উৎপাদনে লক্ষ্মীপুরের সম্ভাবনা
লক্ষ্মীপুর দেশের অন্যতম নারকেল উৎপাদনকারী জেলা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলায় বিস্তীর্ণ এলাকায় নারকেলবাগান রয়েছে। বাড়ির আঙিনাতেও রয়েছে অসংখ্য নারকেলগাছ। ফলে নারকেল থেকে ছোবড়া সংগ্রহের একটি স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
নারকেলের ছোবড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শিল্পের সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা যুক্ত। সঠিক পরিকল্পনা, উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এই শিল্পের সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।
প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ছোবড়ার আঁশ ও গুঁড়া থেকে তৈরি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে এ খাতের মোট উৎপাদন, বিক্রি ও আয়ের নির্ভুল সরকারি হিসাব এখনো সীমিত বলে পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া গেলে এই শিল্প আরও সংগঠিত হতে পারে। একই সঙ্গে ছোবড়ার মতো অবহেলিত কৃষিজ উপজাতের কার্যকর ব্যবহার পরিবেশের ওপর বর্জ্যের চাপ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
ফেলে দেওয়া নারকেলের ছোবড়া এখন আর শুধু বর্জ্য নয়; লক্ষ্মীপুরে এটি ক্ষুদ্রশিল্প, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।
✍️ মন্তব্য লিখুন